superadmin
প্রকাশ : Jul 29, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

ঔষধের বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ॥ বিপাকে সাধারণ ক্রেতা

মোঃ আশরাফুজ্জামান, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি : মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম খাত হলো স্বাস্থ্য। স্বাস্থ্য সুরক্ষার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী ও জীবন রক্ষাকারী ঔষধ কেনা সাধারণ মানুষের জন্য এক প্রকার বড় অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হয়েছে। দেশের খুচরা ঔষধ ব্যবসায়ীদের সমিতির একতরফা ও খামখেয়ালী সিদ্ধান্তের কারণে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ঐতিহ্য ভেঙে এখন এমআরপি (সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য) বা প্রিন্টেড দামেই ঔষধ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ক্রেতারা। এতে করে চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন সাধারণ ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন জেলার মতো কুড়িগ্রাম জেলার সব উপজেলায় ঔষধ ব্যবসায়ী সমিতির কড়া নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো ফার্মেসিতেই আর আগের মতো ইচ্ছামতো ছাড় দিয়ে ঔষধ বিক্রি করা যাবে না। অথচ মাত্র কিছুদিন আগেও খুচরা বাজারে প্রেসক্রিপশনের বিভিন্ন ঔষধ ও চিকিৎসা সামগ্রী ক্রয়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। স্থানীয় সমিতির এই অঘোষিত সিন্ডিকেট ও স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের বরখেলাপ করলেই সাধারণ ব্যবসায়ীদের জরিমানা কিংবা একঘরে করে দেওয়ার মতো হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়েই খুচরা বিক্রেতারা গায়ে লেখা পূর্ণ মূল্যেই ওষুধ বিক্রি করছেন।
বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগ যেমন - উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কিডনি জটিলতা এবং ক্যানসারের মতো মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের প্রতিমাসে বড় অংকের টাকা ঔষধের পেছনে খরচ করতে হয়। আগে যেখানে ক্রয়ে ১০% ছাড় পাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি মিলতো, এখন পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
কুড়িগ্রাম কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সভাপতি মোহাম্মাদ আতাউর রহমান খান হেরিক এর সাথে ঔষধের বাজারদরের বিষয়ে আলাপকালে জানা যায়, গত এপ্রিল মাসে জেলা প্রশাসনের মাসিক সভায় ৩% কমিশনে জেলার দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে এমআরপি ব্যতিরেকে ঔষধ বিক্রি করার সিদ্ধান্ত হয় এবং সেই হিসেবে জেলায় সব ঔষধ ব্যবসায়ী বিক্রি করছেন।
এই প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন যে, জেলা প্রশাসন কর্তৃক যে ৩% কমিশন দুস্থ ও অসহায়দের জন্য ছাড় দিতে বলেছে এর বাইরে কোন ব্যবসায়ী যদি বেশি কমিশনে ঔষধ বিক্রি করে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সমিতি থেকে এরূপ কড়াকড়ি সিদ্ধান্তের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন আজ দুর্বিষহ।  শহরের সদর হাসপাতাল সংলগ্ন ফায়ার সার্ভিস মার্কেটের বড় ঔষধ ব্যবসায়ী  শ্যামল ফার্মেসি, টাউন ফার্মেসী পাইকারি ঔষধ বিক্রি করলেও ফার্মেসির সামনে  নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের এক প্রবীণ অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক ধীরেন চন্দ্রের সাথে এ ব্যাপারে কথা বললে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আগে মাসে ৪ হাজার টাকার ওষুধ কিনলে ৪০০ টাকার মতো ছাড় পাওয়া যেত, যা দিয়ে সংসারের অন্য কোনো খরচ চলতো। এখন  খুচরা দোকানদার সিন্ডিকেট করে সেই ছাড় পুরোপুরি বন্ধ করে রেখেছে। ফলে বাধ্য হয়ে মাত্র ৩% কমিশনে অনেক দূর থেকে এসে শ্যামল ফার্মেসী থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে।
উল্লেখ্য, শহরের কিছু কিছু বড় দোকান ৩% কমিশনে ঔষধ বিক্রির সিদ্ধান্ত মেনে চললেও জেলা শহরের অধিকাংশ ব্যবসায়ী সেটা মেনে চলেন না। আর  উপজেলা বা গ্রামের বাজারের ঔষধ ব্যবসায়ীরা কোন প্রকার ছাড় দেয় না। উপজেলার দাসের হাট থেকে আগত রহিম মিয়া জানান, কমিশন বাতিল হওয়ায় আমাদের মতো গরিব মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে।
ঔষধ একটি জরুরি ও মানবিক সেবা খাত। এখানে কোনো সিন্ডিকেট বা মনগড়া সিদ্ধান্ত জনস্বার্থের পরিপন্থী। প্রতিযোগিতা আইন এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী বাজার নিয়ন্ত্রণকারী এ ধরনের অনৈতিক সিন্ডিকেট সম্পূর্ণ অবৈধ।
এ ব্যাপারে সহকারী পরিচালক জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কুড়িগ্রাম জেলা কার্যালয় (অতিরিক্ত দায়িত্ব) শেখ সাদী  বলেন, সিন্ডিকেট করে কেউ পণ্য বিক্রি বাধ্য করতে পারে না। এরূপ যদি কোন অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে আমরা সেই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। কুড়িগ্রাম এম এ ছাত্তার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও জেলা স্কাউটস এর সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন ফারুক বলেন, যদিও জেলা প্রশাসন থেকে ৩% কমিশনে দুস্থ পরিবারের কাছে ঔষধ বিক্রি করার সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়েছে, কিন্তু আমি মনে করি, কুড়িগ্রাম যেহেতু অতিদরিদ্র জেলা সেখানে সকলের জন্য কমিশনের হার বৃদ্ধি করা উচিত।
মেসার্স সোনা মনি ফিলিং স্টেশনের সত্ত্বাধিকারী আবুল কালাম আজাদ বাবু বলেন, সরকার যদি ঔষধ শিল্প মালিকদের সাথে বসে প্রকৃত ঔষধ উৎপাদন খরচের ভিত্তিতে প্রতিটি ঔষধের দাম নির্ধারণ করে, তাহলে প্রতিটি ঔষধের দাম  সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে।
তিনি আরও বলেন, বাজারে কিছু কিছু ঔষধ কোম্পানি যেমন- ফার্মিক, ব্রিস্টল, কেমিস্ট এই জাতীয় কোম্পানি সরকারের অনুমোদনপ্রাপ্ত অথচ তাদের উৎপাদিত ঔষধের পাইকারি বিক্রয় মূল্য অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় অনেক কম। কিন্তু খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে সেগুলিও এমআরপি মূল্যে সাধারণ মানুষ ক্রয় করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে ঔষধের ব্যবসায়ীরা হচ্ছেন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের জোরালো দাবি, অবিলম্বে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। সমিতিসমূহের এই একচেটিয়া দৌরাত্ম্য বন্ধ করে ঔষধের বাজারে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা, নিম্নমানের ঔষধ বিক্রি বন্ধ করা এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় নাগালের মধ্যে রাখতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাংলাদেশিদের জন্য চীনের ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজ: ফিঙ্গারপ্রিন

1

ফের কমলো স্বর্ণের দাম

2

১৪ এপ্রিলের আগেই বগুড়া-৬ ও শেরপুর-৩ আসনে ভোট

3

কে হচ্ছেন ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা? খামেনির দ্বিত

4

সিরাজগঞ্জে পৌর কাঁচাবাজার চালু না হওয়ায় সুফল পাচ্ছে না জনগণ

5

শীতে অ্যাজমা বা হাঁপানি রোগী ভালো থাকবেন যে উপায়ে

6

মতামত ছাড়াই পুলিশের পোশাক পরিবর্তন: পুনর্বিবেচনার জোর দাবি

7

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পুনঃভর্তি ফি নিষিদ্ধ; অনিয়ম করলে কঠোর ব্যব

8

বগুড়ায় ‘অতিথি সেজে বাড়িতে ঢুকে’ অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্ত

9

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাত কত দিন টেনে নিতে পারবে ইসরায়েল

10

রাজধানীতে সার্ভিসিং সেন্টারে প্রাইভেটকারে বিস্ফোরণ: শিশুসহ দ

11

নৌপ্রধানকে ভাইস অ্যাডমিরাল র‌্যাংক ব্যাজ পরিয়ে দিলেন প্রধানম

12

যশোরে আ’লীগের মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা

13

সিআরবিতে গাছ কেটে ফের হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ, বিরোধিতায় ম

14

স্বতন্ত্র এমপিদের সমর্থনে সংরক্ষিত আসনে এমপি হচ্ছেন জান্নাতু

15

গাজীপুরে জাল ডি.সি.আর. (ডুপ্লিকেট কারেন্ট রেকর্ড) ব্যবহার কর

16

এলপিজির দাম নিয়ে সুখবর দিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী

17

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সমীক্ষা সমাপ্ত হয়েছে : প্রধান

18

সাতকানিয়ায় অবৈধ ইটভাটায় অভিযানে ৩ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড

19

পত্নীতলায় বিজিবির অভিযানে ১০০ পিস নেশাজাতীয় ট্যাপেন্টাডল ট্য

20
ফটোকার্ড বানাতে ক্লিক করুন