আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী ব্যুরো : রেলের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ভুল, অব্যবস্থাপনা এবং গাফিলতির কারণে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। কোথাও কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওয়াশ প্ল্যান্ট কাঙ্খিত কাজে আসছে না, কোথাও কোটি টাকা ব্যয়ে আনা ডেমো পড়ে আছে, আবার ১২৫টি ওয়াগন আনার পরও সেগুলো দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার না করে ফেলে রাখা হয়েছে। কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় আনা ৩০ থেকে ৪০টি লোকোমোটিভও সামান্য বেয়ারিং সমস্যায় পড়ে থাকায় বিপুল অর্থের ক্ষতি হচ্ছে। এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। রেলের কোথায় সমস্যা, কোথায় সিদ্ধান্তহীনতা এবং কোথায় বাস্তবায়নে গাফিলতি রয়েছে-এসব বিষয় তাদের অজানা থাকার কথা নয়। এরপরও ভুল সিদ্ধান্তের কারণে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ক্ষতি হলে এর দায় কে নেবে, সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
একদিকে সামান্য হুইলচেয়ার ও ট্রলির মতো যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে বেসরকারি সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে রেলের বিভিন্ন প্রকল্প ও সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনায় ভুলের কারণে কোটি কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে। ডেমো প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কাঙ্খিত ফল না পাওয়া এবং ১২৫টি ওয়াগন এনে ফেলে রাখার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
একইভাবে কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় আনা ৩০ থেকে ৪০টি লোকোমোটিভের অনেকগুলো সামান্য বেয়ারিং সমস্যার কারণে অচল হয়ে পড়ে আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে একদিকে রেলের সক্ষমতা কমছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকার সম্পদ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকছে। এসবের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের অনেকেই এখনো রেলে কর্মরত, আবার কেউ কেউ অবসরে গেছেন। ফলে পুরোনো সিদ্ধান্ত ও প্রকল্পগুলোর দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, রেলের যে সক্ষমতা রয়েছে, তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু নতুন প্রকল্প গ্রহণ নয়, বিদ্যমান অবকাঠামো, কোচ, লোকোমোটিভ ও অন্যান্য সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে যাত্রীদের সঙ্গে রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভালো আচরণ ও দায়িত্বশীল সেবাও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য রেলসেবা আরও মানবিক ও সহজগম্য করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো প্রতিবন্ধী যাত্রী স্টেশনে প্রবেশ করলে রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবাদানকারী ব্যক্তিদের এগিয়ে এসে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।
নতুন কোনো রেল প্রকল্পে পরে গিয়ে প্রবেশগম্যতার বিষয় যুক্ত না করে শুরু থেকেই তা পরিকল্পনায় রাখতে হবে। স্টেশন, প্ল্যাটফর্ম, ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস এবং টিকিটিং ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিদ্যমান স্টেশনগুলোও পর্যায়ক্রমে উন্নয়ন করতে হবে। একসঙ্গে সব স্টেশন সংস্কার বা আধুনিকায়ন করা সম্ভব না হলে গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃনগর, ইন্টারচেঞ্জ এবং অধিক যাত্রী ব্যবহার করে-এমন স্টেশনগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নতুন কোচে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের চলাচলের সুবিধা, প্রবেশগম্য টয়লেট, পর্যাপ্ত দরজা ও হ্যান্ডরেল নিশ্চিত করার পাশাপাশি রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না; প্রতিবন্ধী যাত্রীরা বাস্তবে এসব সুবিধা ব্যবহার করতে পারছেন কি না, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে।
যাত্রীসেবার মান বাড়াতেও রেলের বিদ্যমান সুবিধাগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। স্টেশন ও ট্রেনের ওয়াশরুম পরিচ্ছন্ন রাখা, ফ্যানসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সচল রাখা এবং ট্রেনে ওঠানামার সময় হুইলচেয়ার ও ট্রলির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যাত্রীছাউনি ও ওয়েটিং রুমগুলোও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও ব্যবহারবান্ধব রাখতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলের সক্ষমতা যতটুকু রয়েছে, তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে যাত্রীসেবার মান অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে ভুল সিদ্ধান্ত, প্রকল্প বাস্তবায়নে গাফিলতি এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ অব্যবহৃত রেখে দেওয়ার ক্ষেত্রে দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।