পাবনা প্রতিনিধি : পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার মুলাডুলি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ এখন শিম ফুলে ফুলে সাদা হয়ে উঠেছে। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই দেখা মিলছে শিমের মাচা আর ফুলের সমারোহ। ফুল বাছাই, মাচা তৈরি ও গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। এরই মধ্যে আগাম জাতের নতুন শিম ‘রুপভান’ ও ‘অটো’ বাজারে উঠতে শুরু করায় ভালো দামও পাচ্ছেন তারা। গত বুধবার পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার মুলাডুলির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শীতকালীন সবজি হিসেবে পরিচিত শিমের আগাম জাত চাষ করে এরই মধ্যে ফলন পেতে শুরু করেছেন কৃষকেরা। বর্তমানে আগাম জাতের শিম প্রতি কেজি ১৩৫ টাকা থেকে ১৪৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিন মুলাডুলি বাজারে প্রায় ৩৫ থেকে ৪৫ মণ আগাম শিম আসছে। আগামী এক মাসের মধ্যে বাজারে শিমের সরবরাহ আরও ব্যাপকভাবে বাড়বে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। শিম চাষকে কেন্দ্র করে মুলাডুলিতে গড়ে উঠেছে বড় ধরনের সবজির আড়ৎ ও ব্যবসায়ী সমিতি। উৎপাদিত শিম এখানকার বাজারে সংগ্রহের পর প্রতিদিন ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। শিমের মৌসুমে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ক্রেতা-বিক্রেতাদের পদচারণায় মুখর থাকে মুলাডুলির শিম বাজার। মৌসুমে প্রতিদিন এই বাজারে কোটি টাকার শিম বিক্রি হয়।
স্থানীয়রা জানান, মুলাডুলি ছাড়াও ফরিদপুর, আটঘরিয়া, শেখপাড়া, রামনাথপুর, রাজাপুর, হাজারীপাড়া, পারখিদিরপুর, কচুয়াকামপুর, দুবলাচরা, প্রতিরাজপুর, গোপালপুর, আড়কান্দি ও মাঝগ্রামসহ আশপাশের প্রায় ২৫ গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে শিম চাষের সঙ্গে যুক্ত। এসব এলাকার জমিতে শিম চাষ হওয়ায় মুলাডুলি এখন দেশের অন্যতম প্রধান শিম উৎপাদন ও বিপণন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শিম উৎপাদনের মৌসুমে মুলাডুলি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৮০ থেকে ১০০ ট্রাক শিম রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। এ চাষকে ঘিরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০/১১ হাজার পরিবার জীবিকা নির্বাহ করছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। শিম চাষের মাধ্যমে এলাকার অনেক বেকার যুবক স্বাবলম্বী হয়েছেন। কয়েক বছর আগেও যেসব এলাকায় পাকা বাড়িঘর ছিল কম, সেসব এলাকায় শিম চাষের আয়ে এখন অনেক কৃষক পাকা বাড়ি নির্মাণ করছেন।
মুলাডুলির শিম চাষিরা জানান, প্রতি বিঘা জমিতে শিম চাষে প্রায় ৪/৫ হাজার টাকা খরচ হয়। মাত্র তিন মাসের এ ফসল থেকে প্রতি বিঘায় প্রায় ২৫/৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা সম্ভব হয়। বর্তমানে রুপভান ও অটো জাতের আগাম শিম বাজারে আসতে শুরু করেছে। এসব জাতের চাহিদা ও দাম দুটোই ভালো।
এদিকে শিম সংরক্ষণে আধুনিক সুবিধার অভাবে কৃষকদের অনেক সময় উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বিক্রি করতে হয়। এ কারণে শিমের সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ আরও সহজ করতে মুলাডুলিতে একটি মাল্টিপারপাস কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
তাদের মতে, সংরক্ষণ সুবিধা তৈরি হলে বাজারে দাম কমে গেলে শিম ধরে রেখে পরবর্তীতে ভালো দামে বিক্রি করা সম্ভব হবে।
ঈশ্বরদী কৃষি কর্মকর্তা জানান, চলতি মৌসুমে ঈশ্বরদীতে প্রায় ১৬ শত হেক্টর জমিতে শিম চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মৌসুমে প্রায় ১৫ শত হেক্টর জমিতে শিম চাষ হয়েছিল। এবার লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, কৃষকরা বর্তমানে শিমের মাচা তৈরি, গাছের পরিচর্যা ও ফুল বাছাইয়ের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ইতোমধ্যে কিছু আগাম জাতের শিম বাজারে উঠতে শুরু করেছে এবং কৃষকরা ভালো দামও পাচ্ছেন। শিম চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সার্বিক সহযোগিতা দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। শিম এখন শুধু একটি সবজি নয়, মুলাডুলি ও আশপাশের এলাকার হাজারো পরিবারের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। উৎপাদন, সংগ্রহ, পরিবহন, আড়তদারি ও পাইকারি বিক্রির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। ফলে শিমের মৌসুমে পুরো মুলাডুলিই যেন পরিণত হয় কর্মচঞ্চল এক কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চলে।