রূপম ভট্টাচার্য্য, চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রামে গ্যাসের সরবরাহ আরও কমে যাওয়ায়
জনজীবনে ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। বাসাবাড়িতে দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে গ্যাস না পেয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, বাস ও অন্যান্য যানবাহনের বড় একটি অংশ সড়কে নামতে পারছে না। ফলে নগরজুড়ে তীব্র যান সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এই সুযোগে অনেক পরিবহন অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
গত সোমবার সকাল থেকে নগরের বহদ্দারহাট, অক্সিজেন, আগ্রাবাদ, হালিশহর, কর্ণফুলী, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, পতেঙ্গাসহ অধিকাংশ এলাকায় বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ ছিল অত্যন্ত কম। কোথাও কোথাও সামান্য গ্যাস এলেও তা দিয়ে রান্না করা সম্ভব হয়নি। অনেক পরিবার গভীর রাতে গ্যাস এলে রান্না করে রাখছেন। আবার অনেকেই বাধ্য হয়ে হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করছেন।
চকবাজার এলাকার বাসিন্দা বিলকিস ফাতেমা বলেন, ‘চুলা খুব অল্প জ্বলছে। একটি রান্না শেষ করতে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় লাগছে। সকাল থেকে শুরু করে দুপুরে রান্না শেষ করেছি।’
খতিবের হাট এলাকার বাসিন্দা আফরোজা স্বপ্না বলেন, ‘দুই দিন ধরে বাসায় গ্যাস নেই। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। হোটেলের খাবার কিনেই চলতে হচ্ছে।’
গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে। নগরের কুলিয়ারচর, কালুরঘাট, অক্সিজেন, বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন স্টেশনে গভীর রাত থেকেই শত শত গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যায়। অনেক চালক ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাননি।
বাসচালক খায়রুল বলেন, ‘রাত থেকে লাইনে আছি। সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে গাড়ি চালাব কখন? আয়-রোজগার প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।’ সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক মো. জুয়েল বলেন, ‘সকাল ছয়টা থেকে লাইনে আছি। বিকেল হয়ে গেলেও গ্যাস পাব কি না জানি না।’
আরেক চালক সোলায়মান বলেন, ‘গ্যাসের লাইনে ৭-৮ ঘণ্টা চলে গেলে মালিকের জমা তোলা কঠিন হয়ে যায়। সরকার যদি কয়েকদিন গ্যাস দিতে না পারে, সেটাও স্পষ্ট করে জানানো উচিত।’
কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকার চালক মো. ইদ্রিস জানান, নিজের এলাকায় গ্যাস না পেয়ে অন্য এলাকায় গিয়ে টোল দিয়ে গ্যাস নিতে হয়েছে। এতে সময় ও গ্যাস- দুই দিক থেকেই ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
গ্যাস সংকটের কারণে নগরে অর্ধেকেরও বেশি সিএনজিচালিত যানবাহন চলাচল করতে পারেনি বলে জানিয়েছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা। ফলে সন্ধ্যায় বহদ্দারহাট, দুই নম্বর গেট, আগ্রাবাদসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে শত শত যাত্রীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কোনো গাড়ি এলেই যাত্রীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয়।
যাত্রী সাইফুল আলম বলেন, ‘সকালে ১০ টাকার ভাড়া ২০ টাকা দিয়ে এসেছি। এখন গাড়িই পাওয়া যাচ্ছে না। যে কয়েকটা আছে, সেগুলোতে ওঠার মতো অবস্থা নেই।’
ষোলশহর এলাকার স্কুলশিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘এক ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করেও কোনো অটোরিকশা পাইনি। শেষ পর্যন্ত কয়েক দফায় যানবাহন বদলে অফিসে যেতে হয়েছে।’
গ্যাস সংকটের প্রভাব শিল্পখাতেও পড়তে শুরু করেছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়ায় লোডশেডিং বেড়েছে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলে দৈনিক প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। অথচ সোমবার সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ১৯৪ মিলিয়ন ঘনফুট। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে সরবরাহ ধারাবাহিকভাবে কমে এসেছে।
কেজিডিসিএল’র এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা জাতীয় গ্রিড থেকে যতটুকু গ্যাস পাচ্ছি, ততটুকুই সরবরাহ করছি। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা পুরোপুরি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে কয়েকদিনের মধ্যে কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।’
গত ২১ জুলাই মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর থেকেই চট্টগ্রামে গ্যাসের সরবরাহ কমতে শুরু করে। এরপর জাতীয় গ্রিড থেকে চট্টগ্রামের বরাদ্দ আরও কমে যাওয়ায় সংকট এখন জনজীবন, পরিবহন ও শিল্প- সব ক্ষেত্রেই গভীর প্রভাব ফেলছে।